Loading...

🔹 গাইবান্ধা পৌর পার্ক

গাইবান্ধা পৌর পার্ক: শতবর্ষী শহরের বুকে এক টুকরো সবুজ স্বর্গ শহরের যান্ত্রিক কোলাহল আর ব্যস্ততার মাঝে এক টুকরো প্রশান্তি আর নির্মল বাতাসের খোঁজে গাইবান্ধাবাসীর মন যেখানে বারবার ছুটে যায়, সেই স্থানটির নাম পৌর পার্ক। এটি কেবল একটি পার্ক নয়, এটি শতবর্ষী গাইবান্ধা পৌরসভার জীবন্ত ইতিহাস, সংস্কৃতির ধারক এবং শহরবাসীর আবেগ ও স্মৃতির এক সবুজ ক্যানভাস। ১৯২৩ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত এই পৌরসভার মতোই পার্কটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহরের বুকে, যেন এক বিশ্বস্ত অভিভাবক।

পার্কের সীমানায় পা রাখতেই নাগরিক জীবনের ক্লান্তি মুছে দিয়ে এক অনাবিল স্নিগ্ধতা মনকে ছুঁয়ে যায়। চারপাশের বৃক্ষরাজি, নাম না জানা পাখির কলতান আর পাতার ফাঁক গলে আসা রুপালি রোদ মিলেমিশে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। দেবদারু, মেহগনি আর কৃষ্ণচূড়া পার্কটিকে একটি প্রাকৃতিক দুর্গের মতো আগলে রেখেছে। ঋতুভেদে পৌর পার্ক তার রূপ বদলায়। বসন্তে ফুলেল সৌরভে মাতোয়ারা হয় চারপাশ, বর্ষায় হয়ে ওঠে আরও সবুজ, আরও প্রাণবন্ত। এটি যেন শহরের ফুসফুস, যা প্রতিনিয়ত বিশুদ্ধ অক্সিজেন জুগিয়ে চলেছে। পৌর পার্কে রয়েছে শিশুদের এক কল্পনার জগৎ। কৃত্রিমভাবে তৈরি বাঘ, হাতি আর হরিণের ভাস্কর্যগুলো শুধু শিশুদের খেলার সঙ্গী নয়, তাদের কল্পনাকে উসকে দেওয়ার এক দারুণ মাধ্যম। দোলনার ছন্দে দুলতে থাকা শিশুদের উচ্ছল হাসি আর কলকাকলিতে পুরো পার্কটি মুখরিত থাকে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা মানুষের ভিড়ে পার্কটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। বাবা-মায়ের হাত ধরে হেঁটে চলা শিশু, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠদের সান্ধ্যকালীন ভ্রমণ-সবকিছু মিলিয়ে এটি গাইবান্ধার সামাজিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে পৌর পার্কের মহিমা কেবল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা বিনোদনের আয়োজনে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে প্রোথিত আছে বাঙালির গৌরব ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। পার্কের এক প্রান্তে গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা শহিদ মিনারটি ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধার এক নীরব তীর্থক্ষেত্র। প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে খালি পায়ে আসা মানুষের ঢল নামে এখানে। আবার, এর বিজয় স্তম্ভটি জানান দেয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে এই স্তম্ভের পাদদেশে অর্পিত প্রতিটি পুষ্পস্তবক নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। এভাবেই পার্কটি বিনোদনের পাশাপাশি দেশপ্রেম ও ইতিহাসের এক জীবন্ত পাঠশালায় পরিণত হয়েছে।

দিনের আলো ফুরিয়ে যখন সন্ধ্যা নামে, তখন পৌর পার্ক এক ভিন্ন রূপে সাজে। কৃত্রিম আলোর বন্যায় পুরো এলাকাটি এক নান্দনিক দৃশ্যের জন্ম দেয়। আলো-আঁধারির খেলায় গাছের ছায়ারা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও উৎসবে যখন পার্কটি বর্ণিল আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়, তখন এর সৌন্দর্য বহুগুণ বেড়ে যায়, যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ ছুটে আসে। প্রকৃতি, বিনোদন, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এমন অপূর্ব সমন্বয়ের কারণেই গাইবান্ধা পৌর পার্ক শুধু একটি স্থান নয়, এটি একটি অনুভূতি। এটি গাইবান্ধা শহরের আত্মা এবং তার হৃদস্পন্দন। শতবর্ষ ধরে পৌর পার্ক শহরবাসীকে ছায়া দিয়েছে, আনন্দ দিয়েছে এবং তাদের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে এক জীবন্ত কিংবদন্তি।